শনিবার, ০৮ জুন ২০২৪ । ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শেরাটন ভবনের হিসাব বুঝে নিতে ডিএনসিসিকে হাইকোর্টের নির্দেশ

অনলাইন ডেস্ক »

নিউজটি শেয়ার করুন

রাজধানীর বনানীতে সিটি করপোরেশনের জমিতে পাঁচতারকা হোটেল শেরাটনের যে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে আগামী দুই মাসের মধ্যে চুক্তি মোতাবেক পাওনা বুঝে নিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এরপর এ বিষয়ে আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছেন আদালত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের প্রতি এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত এক রিটের প্রাথমিক শুনানির পর সোমবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাইকোর্ট বেঞ্চে রুলসহ এ আদেশ দেন। দুইপক্ষের চুক্তির আলোকে তাদের পাওনা বুঝে না নেওয়ার নিস্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, এ মর্মে রুলও জারি করেছেন আদালত। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র, বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেডসহ সংশ্লিষ্টদের রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

আদালতে বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী রমজান আলী শিকদার ও মো. আবু তালেব। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী ইমতিয়াজ মইনুল ইসলাম নীলিম। আর রিটের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সাইফুদ্দিন খালেদ। আদেশের বিষয়ে আইনজীবী আবু তালেব বলেন, ‘বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের সঙ্গে ডিএনসিসি’র যে চুক্তি এবং তাদের যে আপস-মিমাংসা সেই মোতাবেক ডিএনসিসি’র প্রাপ্য আগামী দুই মাসের মধ্যে বুঝে নেয় সেই মর্মে নির্দেশনামূলক আদেশ হয়েছে। এ বিষয়টি তিন মাসের মধ্যে লিখিত আকারে আদালতকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।’

আদালতে শুনানির বিষয়ে এই আইনজীবী বলেন, ‘রিট পিটিশনে দুর্নীতির গন্ধ পাওয়ার কথা অভিযোগ আকারে উল্লেখ করা হয়েছিল। পাবলিকের ইন্টারেস্ট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। আদালত সবপক্ষের বক্তব্য শুনে এই মর্মে প্রাথমিকভাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন যে, এখানে তো দুর্নীতির বিষয় না, এখানে মূখ্য বিষয় হচ্ছে যে চুক্তিভুক্ত বিষয়। চুক্তি মোতাবেক ডিএনসিসি’র জন্য যে অংশ বরাদ্দ তারা বুঝে নিচ্ছে না কেন। সেজন্য সিটি করপোরেশন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে একটি চিঠিও দিয়েছিল। সেই চিঠিতেই স্পষ্ট যে, ডিএনসিসি ও বোরাক রিয়েল এস্টেটের সঙ্গে একটি সমঝোতা করেছে, সেই সমঝোতার ভিত্তিতে তারা ৩০ শতাংশের জায়গায় ৪০ শতাংশ যাতে বুঝে নিতে পারেন সেই কথা বলেছেন। এখন সেই চিঠির প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় যদি নিষ্পত্তি করে দেয় তাহলে বিষয়টি মিমাংসা হয়ে যায়। এই বিষয়টি ত্বরান্বিত করতে আজকে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছেন। রিটকারী যে অভিযোগ দিয়েছেন সেসব বিষয় আদালত গ্রহণ করেননি।’

এদিকে রিটকারী আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, ‘আদালত রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে বোরাক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছ থেকে সিটি করপোরেশন যেন তার পাওনা ফ্ল্যাট দুই মাসের মধ্যে বুঝে নেয় সেই নির্দেশ দিয়েছেন। আর তিন মাসের মধ্যে পাওনা ফ্ল্যাট বুঝে পাওয়ার বিষয়টি হলফনামা আকারে আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।’

‘সরকারি জমিতে পাঁচ তারকা হোটেল’ শিরোনামে গত ১ জুন প্রথম আলো একটি সংবাদ প্রকাশ করে। ইতোমধ্যে মানহানীকর সংবাদ প্রকাশ করায় দৈনিক প্রথম আলোর সম্পাদক ও প্রকাশক মতিউর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক মোহাম্মদ মোস্তফাকে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছেন বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেড ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহা. নূর আলী। নোটিশ পাওয়ার দুই দিনের মধ্যে প্রথম আলোর অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংবাদটি অপসারণ এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে বলা হয়েছে ওই নোটিশে। এছাড়া মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় প্রথম আলো কর্তৃপক্ষকে শর্তহীনভাবে লিখিত ক্ষমা চাইতেও বলা হয়েছে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত ওই মিথ্যা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত রোববার হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের ৭ মে রাজধানীর বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভেনিউয়ে ৪৪ নম্বর প্লটে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি সম্পাদিত হয় ঢাকা সিটি করপোরেশন ও বোরাক রিয়েল এস্টেট লিমিটেডের মধ্যে। চুক্তি অনুযায়ী সমস্ত সরকারি নিয়ম ও বিধি-বিধান মেনেই সেখানে হোটেল শেরাটন ভবন নির্মাণ করে বোরাক রিয়াল এস্টেট লিমিটেড। প্রকল্পটি বোরাক রিয়েল এস্টেট ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের যৌথ মালিকানাধীন প্রকল্প।

শেরাটন হোটেল নির্মাণে ২০০৭ সালের ২৫ জুন ঢাকা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন অথরাইজড অফিসার কর্তৃক (প্রধান প্রকৌশলী) ৩০তলা ভবনের নকশা অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০০৭ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বুয়েট কর্তৃক ৩০তলা ভবনের স্ট্রাকচারাল নকশা ভেটিংসাপেক্ষে ভবনটি নির্মিত হয়েছে। এরপর ২০০৭ সালে সিটি করপোরেশন কর্তৃক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ৩০তলার ছাড়পত্র গ্রহণ করা হয় (সিটি করপোরেশন, ডিএমপি, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, তিতাস, পরিবেশ অধিদপ্তর, ডেসকো, ঢাকা ওয়াসা ইত্যাদি)। সিটি করপোরেশনের আরএফপি অনুসারে ৬০ কাঠা জমির ওপরই ভবন নির্মাণের জন্য ২০০৪ সালের ১০ এপ্রিল দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল।

এরপর ২০১১ সালের ২৭ নভেম্বর ডিএনসিসির তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ১৫ থেকে ৩০তলার ভবন নির্মাণের বিষয়টি মেয়র কর্তৃক অনুমোদন হয়েছে মর্মে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার সচিবকে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করে। সে সময় মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং বোরাক রিয়েল এস্টেটকে ২০১৫ সালের ৩১ মে লিখিতভাবে অবহিত করেন।

বোরাক রিয়েল এস্টেট তাদের প্রাপ্য শেয়ারের নিজ জায়গায় হোটেলটি স্থাপন করেছে যা ১২-২৮তলা পর্যন্ত অবিস্থত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অংশ সংরক্ষিত রয়েছে যা ৪-১১তলা পর্যন্ত অবস্থিত। ডিএনসিসি এই সংরক্ষিত প্রাপ্য অংশ যে কোনো সময় বুঝে নিতে পারে। উল্লেখ্য, ডিএনসিসির প্রাপ্য অংশে হোটেল শেরাটনের কোনো কিছুই অবস্থিত নয়।
প্রকল্পটির ১৫ থেকে ২৮তলার শেয়ার বণ্টন প্রক্রিয়াটি দুই পক্ষের মধ্যে ইতোমধ্যে মেয়রের সভাপতিত্বে ডিএনসিসির বোর্ডসভায় তাদের অনুকূলে ৩০ শতাংশের পরিবর্তে ৪০ শতাংশ শেয়ার অনুমোদিত হয়েছে।

১৪তলা পর্যন্ত শেয়ার বণ্টন নিয়ে কোনো দিনই কোনো প্রশ্ন ছিল না। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন উক্ত সিদ্ধান্ত চিঠির মাধ্যমে ২০২৩ সালের ২ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবকে অবহিত করেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের প্রাপ্য ৪০ শতাংশ অর্থাৎ ৪ থেকে ১১তলা পর্যন্ত তাদের প্রাপ্য অংশ যে কোনো সময় বুঝে নিতে পারে।

আপনার মন্তব্যটি লিখুন
শেয়ার করুন »

মন্তব্য করুন »